Sunday, April 13, 2014

প্রেমের সপ্তবর্ণ

প্রেম-১
কাজিন হওয়াতে জড়তাটা ছিল না। একসাথে খেলতাম, ঘুরতাম এমনকি বাঁশঝাড়ে লুকিয়ে দুজন মিলে সিগারেট পর্যন্ত খেয়েছি। আমার খালাত- বোন মিলির কথা বলছি। দুজন একি স্কুলের একি ক্লাসে পরতাম। আমার খালা আমাদের বাসার দোতলায় থাকতেন। তখন বয়ঃসন্ধি সবে উঁকি দিয়েছে। লুকিয়ে কিছু প্রেমের বই পড়েছিলাম। তাতে প্রেম করার খুব সাধ জেগেছিল। মিলিকে নিজের প্রেমিকা ভাবতে খুব ভাল লাগতো। বন্ধুরা বলতো প্রথম প্রেমের নাকি তুলনা নেই। প্রথম প্রথম ব্যাপারটাকে এতো গুরুত্ব
দেইনি। কয়দিন পর দেখি সারাক্ষন মাথার মধ্যে মিলি ঘোরে। মিলির সাথে এতো ফ্রি হলেও আমার ভাললাগার কথা বলতে সাহস হল না। ক্লাস এইটের বৃত্তি পরীক্ষা দিয়ে দুজন মিলে ঠিক করলাম দুজনে মিলে সিনেমা দেখতে যাবো। যেই ভাবা সেই কাজ। টাইটানিক দেখে এতই ইমোশনাল হয়ে পরলাম যে হল থেকে বেড়িয়েই হড়বড় করে মিলিকে বললাম, তোকে অনেক ভালবাসি। মিলি কিছুই বলল না। ভাবলাম সময় নিয়ে জানাবে। ও যে কাজটা করল তা স্বপ্নেও ভাবিনি। ও সরাসরি ওর মায়ের কাছে বলে দিল। ফলাফল স্বরূপ খালা প্রচণ্ড রেগে গেলেন। আর আমার বাসায় আমার কি হল সেটা না হয় নাই বললাম। মিলিকে অনেক ভালবেসেছিলাম। ও আমাকে ফিরিয়ে দিলেও এত কষ্ট পেতাম না যতটা কষ্ট পেলাম খালামনিকে বলাতে। কিছুদিন পর খালু বদলী হওয়াতে ওরা সিলেটে চলে গেল। এভাবেই ইতি হল আমার প্রথম প্রেমের।
প্রেম-২
ক্লাস টেনে প্রি-টেস্টের পর রশিদ স্যারের ওখানে প্রাইভেট পড়তে গেলাম। ওখানে মিশু নামের একটি সুন্দরী মেয়ে পড়তো। অংক একটু ভাল পারতাম বলে রশিদ স্যার প্রায়ই আমাকে দায়িত্ব দিয়ে চলে যেতেন। মিশু প্রায়ই আমার কাছে অঙ্ক বুঝতে আসতো। একদিন বাসায় ফিরে অঙ্ক বইয়ের ভিতর দেখি মিশুর একটি চিরকুট। ছোটখাটো প্রেমপত্রই বলা যায় এটাকে। পরদিন আমাকে চমকে দিয়ে মুরাদ অঙ্ক প্রাইভেটে সবাইকে এটা পড়ে শুনালো। আসলে আমি অঙ্ক বই থেকে এটা সরাতে ভুলে গেছিলাম। চরম অপমানিত মিশুকে আর কখনো অঙ্ক প্রাইভেটে দেখিনি। বেচারি আমার প্রতি একটা ভুল ধারনা নিয়ে গেল।
প্রেম-৩
ইন্টারে উঠলে একটা গার্ল ফ্রেন্ড না থাকলে কি হয়। কলেজের প্রথম দিনেই একটা মেয়েকে ভাল লেগে গেল। কেমিস্ট্রি প্রেকটিকেল ক্লাসে মেয়েটার সাথে চোখাচোখি হল কিছুদিন। ২ সপ্তাহ মেয়েটাকে ফলো করার পর ভাবলাম একটা চেষ্টা নেই যা আছে কপালে। কিন্তু প্রেমদেবতা এবারও উপহাস করলেন আমায়। খবর পেলাম মেয়েটা হিন্দু। ভীষণ কষ্ট পেলাম।
প্রেম-৪
ভার্সিটির ফাস্ট ইয়ার ফাইনাল শেষে মাথায় ২০ দিনের জন্য বন্ধ পেলাম। যাবার আগের দিন আমার ক্লাসমেট মীম আমাকে প্রপোজ করলো আমার এক বন্ধুর মাধ্যমে। ও অবশ্য কালো হলেও চটপটে মেয়ে ছিল। ওকে বললাম ছুটি থেকে এসে আমার সিদ্ধান্ত জানাবো। ছুটির ২০ দিনে ওকে নিয়ে কত কল্পনা সাজালাম। ছুটি থেকে ফিরে শুনলাম সে নাকি আরও কয়েকজনকে প্রপোজ করেছে। যে তাকে সিলেক্ট করে তার সাথেই তার প্রেম হবে। প্রেম কি আর মঘের মুল্লুক। আবারও আশাহত হলাম।
প্রেম-৫
আফরিন আমার একবছরের ছোট, যথেষ্ট সুন্দরী। আমাদের ভার্সিটিতেই পরে। একটু রিজার্ভ মেয়ে। মেয়েটাকে আমার খুব ভাল লাগতো। আসলে ভাল লাগলেও কখনও পাবার আশা করিনি। অনেক হ্যান্ডসাম ছেলের প্রপোজাল ফিরিয়ে দিয়েছে। সে নাকি পন করেছে প্রেম করবে না। তাই প্রপোজাল দিয়ে নিজের ইম্প্রেসন নষ্ট করতে চাইলাম না। কিছুদিন পর দেখি একটা ক্যাবলা ছেলের হাত ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পরে জুনিয়র ভাইদের থেকে শুনলাম আফরিনও নাকি আমাকে হাল্কা-পাতলা লাইক করত। হয়তো প্রস্তাব দিলে রাজি হয়ে যেতো। এটা শুনে আফসোসটা আর বেড়ে গেলো।
প্রেম-৬
প্রেমের খোঁজে আমি তখন ক্লান্ত। ভার্সিটির শেষ বর্ষে তাই আর নতুন কোন ঝামেলায় জড়াতে চাইলামনা। কিন্তু প্রেম এবার ঘাড়ের উপর এসে পড়ল। যথেষ্ট সুন্দরী, মায়াময়ী লম্বা চুলের অধিকারী নুসানকে অপছন্দ করাটা একটু কঠিনই। মেয়েতো আমার জন্য পুরোই দিওয়ানা। দিনরাত আমাকে ফোন করতো। অবশেষে রাজি হলাম। দুদিন পর রেজা বলল, ভাইয়া এই মেয়ের ভিডিও বের হয়েছে, চাইলে দেখতে পারেন আমার মোবাইলেই আছে। বুঝতে পারলাম প্রেম জিনিসটা আসলে আমার জন্য নয়।
প্রেম-৭
এখন কাজের চাপে দম ফেলার একদম সময় পাই না। কর্পোরেট কোম্পানিতে চাকরীর ব্যস্ততার জন্য নিজের খবরই রাখতে পারিনা। আমার বিয়ে নিয়ে মায়ের চিন্তার শেষ নাই। প্রতিবার বাড়িতে গেলেই ২০- ২২টি মেয়ের ছবি নিয়ে হাজির হয়। কারো মধ্যেই তেমন বিশেষত্ব খুজে পাইনা। হঠাৎ একদিন দেখি মিলির মা মানে খালা আমার বাসায় হাজির। রাতের বেলা মা ইনিয়ে বিনিয়ে মিলির কথা বললেন। খালা অলরেডি মাকে কনভিন্স করে ফেলেছেন। আমিতো মায়ের কথা শুনে রেগে গেলাম। মা আর আমায় জোর করল না। শুনলাম মিলির জীবনে আমার পর আর কেউ আসেনি। সারারাত অনেক ভেবে দেখলাম মিলির মত আসলে কাউকেই ভালবাসতে পারিনি। মাঝে মাঝে ভাবি মিলি কেন আমাকে ফিরিয়ে দিল। হয়তো আবেগ সামলাতে পারেনি। হাজার হোক সে আমার প্রথম আর সত্যিকার প্রেম। ও হয়তো আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছে কিন্তু আমিও কি ওকে ফিরিয়ে দেবো? অনেক ভেবে দেখলাম আমি প্রতিশোধ নিতে চাইলে হয়তো আমার মনের ক্রুদ্ধ বাসনা পূর্ণ হবে কিন্তু ভালবাসার মানুষটিকে পেয়েও হারাবো।
গত ১৬ই ডিসেম্বর মিলির সাথে আমার এনগেজমেন্ট হয়ে গেল। আল্লাহ চাইলে সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ২রা মার্চ আমাদের বিয়ে হবে। সে রাতেই বিচার হবে মিলির…কেন আমার নিস্পাপ প্রেমকে আজ থেকে ১৩ বছর আগে গলা টিপে হত্যা করেছিল (হা হা হা) সবাই আমাদের জন্য দোয়া করবেন।
~~~ THE END ~~~

No comments:

Post a Comment