Sunday, April 13, 2014

শ্বেতশুভ্র ভালোবাসা।

ইদানিং কি হয়েছে জানো, সকালে উঠেই তোমার দেয়া সেই জাপানী কাঠের আলমারিতে রাখা পুতুলটার দিকে চোখ যায়। দেখলেই মনে হয় আমাকে ভেঙ্গাচ্ছে…আর তোমাকে মনে করিয়ে দেয়। ভুল বললাম, তোমাকে মনে করার সুযোগ কই… তুমিতো আছ আমার মনেই। তোমার এই জাপানী পুতুলের নীরব উপহাসের হাত থেকে আমায় রক্ষা করে মুনা। ও আচ্ছা তুমিতো আবার মুনাকে চেন না। মুনা আমার লক্ষ্মী বউ। ভ্রু কুচকিও না…ও তোমার সবকিছু জেনেই আমাকে বিয়ে করেছে।

তোমাকে হারাবার পর ঠিক করেছিলাম আর কারও সাথে এই অপয়া জীবনটা জড়াবো না। কিন্তু বৃদ্ধ বাবা-মার হাত জোর অনুরোধ ফেলতে পারিনি। বাসর রাতে তোমার গল্প ও অনেক আগ্রহ ভরে শুনেছে। মাঝে মাঝে সে যখন আমার বুকে মাথা রাখে, তখন মনের অজান্তেই চোখের কোন থেকে এক ফোটা অশ্রু ঝরে পরে। মুনা হয়তো ভাবে আমি হয়তো তোমার কথা ভেবে মন খারাপ করছি। আসলে মন খারাপ হয় মুনার জন্যই… প্রতিটা মুহূর্তে মনে হয় মুনার সাথে প্রতারনা করছি। এই মেয়েটা ভালবেসে মাথা রাখছে আমার বুকে…সেই আমি কিনা ভাবছি আরেকজনের কথা। নিজেকে কুকুরের চেয়েও অধম মনে হয়।
কি করব বল, একটা মুহূর্তের জন্যও তোমাকে ভুলতে পারিনা। নিজেকে মিথ্যে সান্ত্বনা আর কত দেবো। মুনা মেয়েটার প্রতি অনেক মায়া বোধ করি। বিধাতা বোধ হয় এই নারী কে তৈরি করার সময় হিংসা দিতে ভুলে গিয়েছিলেন। মনে আছে তুমি একদিন বলেছিলে আমাদের প্রথম ছেলের নাম রাখবে আব্দুল্লাহ। মুনাকে একদিন কথাচ্ছলে এটা বলেছিলাম। মুনাও ঠিক করেছে এটাই তার ছেলের নাম হবে। মেয়েটা আসলেই দুর্ভাগা, নাহলে আমার মত অপয়ার ভাগ্যে জুটবে কেন। আমি ব্যর্থ…ওর ভালবাসার মূল্য দিতে পারলাম না।
তোমার কি মনে আছে, প্রতি মাসের ১৩ তারিখটা তুমি আমার জন্য আলাদা করে রেখে দিতে। আমাদের দেখা হতো ধানমণ্ডি লেকের পারের ডিঙ্গি রেস্তোরার সবচেয়ে কোনার আসনে। তোমার সাথে ৪ বছর ৭ মাস ১৭ দিনের সম্পর্কে একবার ছাড়া কোনবারই তুমি ১৩ তারিখটা মিস করনি। একবার তোমার পা মচকে যাওয়ায় আসতে পারনি। তোমার কি মনে আছে সেদিন বিকাল বেলা ফোন করে কি কান্নাটাই না কেদেছিলে। তোমার শুধু পছন্দের খাবার ছিল ব্ল্যাক-কফি। লেকের দিকে মুখ করে কফি খেতে অনেক ভালবাসতে তুমি। এখন হাজার ঝামেলার মাঝেও মাসের ১৩ তারিখ বিকালটা আমার ডিঙ্গিতেই কাটে। কফি নিয়ে আনমনে তাকিয়ে থাকি লেকের দিকে। যখন চোখটা ভিজে আসে তখন আস্তে উঠে চলে আসি। কফির মগে কফির উচ্চতা একি থেকে যায়।
বড্ড ইমোশনাল ছিলে তুমি। তোমার আবেগগুলোকে আমি সবচেয়ে বেশি ভালবাসতাম। মাঝে মাঝে ভাবি, তুমি কি পারতে না আমায় আর একটা সুযোগ দিতে। তুমি বলাতেই ডাচ-বাংলা ব্যাঙ্কে জয়েন করলাম। পেশাগত কারনেই সবার সাথে ভাল সম্পর্ক রাখতে হয়। এটা তুমি বুঝেও বুঝতে না। ব্যাংকের বার্ষিক পিকনিকে একজন লেডি-কলিগের সাথে তোলা ছবি দেখে কি কাণ্ডটাই না করেছিলে। তাহলে তুমি কি আমায় বিশ্বাস করতে না? তোমার সন্দেহ দেখে নিজেকে খুব ছোট মনে হতো। তুমি বলতে আমাকে অনেক ভালোবাসো বলেই সন্দেহ কর। তুমি নাকি সবসময় আমাকে হারিয়ে ফেলার ভয় করতে। কিন্তু কখনই তোমার ভয়ের কারণটা ধরতে পারিনি। প্রত্যেকটা সকালে তোমাকে ফোন দিয়ে তোমাকে জাগাতাম, অফিসে যাবার আগে তোমার সাথে একটু কথা বলে নিতাম। তোমার সাথে কথা না বলে অফিসের কোন কাজেই উৎসাহ পেতাম না। তুমি বলার দুদিনের মাথায় ডাচ-বাংলা ব্যাংকের লোভনীয় বেতনের চাকরি ছেড়ে দিলাম। দুমাস পর অনেক কষ্টে এনসিসি ব্যাংকের চাকরিটা জোগাড় করলাম।
তোমার কি মনে আছে আমার সেই বেকার দিনগুলোর কথা। পর পর পাঁচটা ইন্টারভিউ দিয়ে যখন চাকরী হল না…তখন ডাচ- বাংলা ব্যাংকের ইন্টারভিউর দিন নিজেই আমার সাথে গেলে। ওই চাকরীটাই আমার হয়ে গেল। প্রথম বেতনের টাকা দিয়ে তোমাকে শাড়ী কিনে দিলাম। শাড়ী পরা তোমাকে যেন আমি নতুন ভাবে আবিস্কার করেছিলাম। কোন মেয়েকে শাড়ি পরলে এতো সুন্দর লাগে তা আমার জানা ছিল না। ওইদিন তুমি জোর করে আমাকে লং- ড্রাইভে নিয়ে গেলে। অথচ মাত্র ড্রাইভিং শিখেছিলে তুমি। জোর করে নিজেই ড্রাইভ করলে।
তোমার কথামত তোমার থার্ড সেমিস্টার শেষে বিয়ের ডেট ঠিক করলাম। কলকাতা থেকে বিয়ের মার্কেটিং করলাম। বিয়ের গহনা কেনা নিয়ে অহেতুক ঝগড়া বাধিয়ে বসলে। চাকরীর চাপে এমনিতেই আমার যায় যায় অবস্থা। তাই হয়তো সেদিন আমিও মেজাজ হারালাম। বিশ্বাস করো রাতের বেলা আমি বাচ্চার মত কেঁদেছিলাম। তুমি ফোন বন্ধ করে রাখলে। অথচ সারাটা রাত আমি তোমাকে ট্রাই করেছিলাম। তিন দিনেও তোমার রাগ ভাঙল না। ব্যাংকের নতুন শাখার উদ্বোধনের জন্য চট্টগ্রামের পটিয়া যেতে হল। তোমাকে বলে যেতে পারলাম না। বিশ্বাস করো সারাটা পথ আমার মনটা খচখচ করছিল। পরের রাতে গা কাঁপিয়ে আমার ১০৪ ডিগ্রি জ্বর এল। জরুরী ভিত্তিতে হাসপাতালে ভর্তি হলাম। সামান্য জ্বরই না হয়েছিল, হয়তো দুদিনপরই ভাল হয়ে যেতো। অথচ খবর শুনেই কি অবুঝের মত কাজটা করলে তুমি। নিজেই ড্রাইভ করে রওনা হলে। একবারও ভাবলে না এই রুটে ২৪ঘণ্টাই বাস থাকে। হয়তো নিয়তির চাপে এমনটা করেছিলে। হয়তো তুমি চেয়েছিলে আমাকে একা করে দিতে। দাউদকান্দির অদুরে একটা লরির পিছনে লাগিয়ে দিলে। তোমাকে দাউদকান্দি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হল। তোমাকে দেখে কে বলবে তুমি অ্যাকসিডেন্ট করেছ। মনে হচ্ছিল যেন তুমি ঘুমিয়ে আছ। মাথার পিছনে একটু আঘাত পেয়েছিলে। তোমাকে দেখতে জ্বর নিয়েই দাউদকান্দি ছুটে এলাম। তিন দিন কোমায় থেকে অবশেষে আমাকে চিরতরে ছেড়ে গেলে। কেন এতো স্বার্থপর হলে তুমি?
তোমার কি মনে আছে সেই ভেরিবাধের সেই নৌকা চড়ার কথা। সেদিন তোমার সামনে সিগারেট ধরানোতে তুমি আমার গাল খামচে দিয়েছিলে। সেই খামচির ভয়ে তোমার সামনে আর কখনই সিগারেট খাইনি। এখন আমি প্রতিদিন ৪৫টা করে সিগারেট খাই। সিগারেট ধরানোর পরই মনের অজান্তেই হাতটা চলে যায় খামচি খাওয়া গালে……এক অদৃশ্য বেদনা অনুভব করি সেখানে। এই সিগারেটই আমাকে নিয়ে আসবে তোমার কাছে…..ঠিক তোমার শ্বেতপাথরের বাড়ীর পাশে। তাইতো প্রতিদিন ভোরে একবার দেখে আসি আমার শ্বেতপাথরের বাড়ির জায়গাটা। এখন আমি লিভারের জটিলতায় ভুগছি। হয়তো ড্রিঙ্কসটা একটু বেশী হয়ে যাচ্ছে বলেই। কেন যেন মনে হয় বেশীদিন বাঁচবো না। আমার বন্ধুবর কাজিকে বলে রেখেছি যেন তোমার পাশেই আমার কবর হয়। তোমাকে আর বেশিদিন একা থাকতে হবেনা। দূর থেকে ঝকঝকে সাদা শ্বেত-পাথরে বাধানো কবর দুটো অনেক সুন্দর দেখাবে। তাই না ?

No comments:

Post a Comment