Sunday, April 13, 2014

কর্পোরেট ভালোবাসা

” আংকেল উঠেন, নবাবের মত ঘুমানোর বয়স আর আপনার না। ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্ট করে নেন। ভাগ না পেলে আমার কোন দোষ নাই’
ঘুম থেকে উঠতে ইদানিং খুব আলসে লাগে। ভোরে নামাজ পরে ঘুমাইছিলাম। অন্যেরা হাঁটতে বের হলেও আমার কেন জানি ঘুমটা একটু বেশি ধরে।
মাঝে মাঝে মনে হয় এই ঘুমটা যদি আর না ভাঙতো!! খুব ভালো হতো। আমার টুকটুকে বউ যেখানে গেছে আমিও সেখানে যেতাম। দুজন মিলে আবার সংসার করতাম।

” কি হলো?? আপনাকে না উঠতে বলেছি!! সবাইকে একসাথে ব্রেকফাস্ট দেয়া হবে। পরে গেলে ভাগ নাও পেতে পারেন। উঠেন!!”
নাহ এই মেয়ে বড্ড বেশি কথা বলে। চোখে চোশমাটা পরে নেই আগে…তাছারা স্যান্ডেলটাও খুজে পাবনা। রাতে যেখানেই রাখি না কেন সকালে উঠে ওটা আর খুজে পাইনা.…
বাথরুমের দিকে হাটা দিলাম। হাটতে গেলে ডান পা টাতে খুব কষ্ট পাই। সেই যুবক বয়সে গাছ থেকে পরে গেছিলাম। সেই ব্যাথা এই বুড়ো বয়সে বেশি জ্বালা দেয়।
দেরিতে উঠার জন্য বাথরুম আজ ফাঁকা পেলাম। তাছারা অন্যদিন সব বুড়া দের সাথে লাইন ধরতে হয়।
কেউ জানে না আমি এখন শুধু হাত দিয়ে দাঁত মাজি। কি আর করবো ব্রাশ করতে গেলে এই দুর্বল দাঁত গুলা দিয়ে যে রক্ত পরে।
ফ্রেশ হয়ে খাবার রুমে গেলাম। গিয়ে দেখি এখনো কিছু বুড়া খাচ্ছে। কোনার রান্না ঘর থেকে নিজের বাটি নিলাম।
সেই এক খাবার প্রতিদিন। কেমন জানি গন্ধ বের হয় রুটি গুলা থেকে। ৩ টা রুটি আর পাতলা ডাল। মাঝে মাঝে খুব আপেল খেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সে কপাল অনেক আগেই হারিয়েছি।
রুটি গুলা আগে পানিতে ভিজিয়ে নেই আমি। কারন দুর্বল দাঁত দিয়ে এই শক্ত রুটি গুলা ছেঁড়া কষ্টকর। এই খাবার খাওয়ার সময় দেখি অনেক বুড়া কাঁদে। সব গুলা পাগল। অতীতের কথা ভেবে কাঁদে। আমার হাসি পায়। অতীতের কথা ভেবে শুধু কষ্ট পেয়ে লাভ টা কি!! সেটাই এই বুড়া গুলা বুঝে না।
” আংকেল, একটা গুড নিওজ আছে। আপনার ছেলে আর ছেলে বউ এসেছে আপনাকে দেখতে।”
মেয়েটার কথা শুনে পুরা চমকে গেলাম। হাত লেগে পানি ভর্তি গ্লাসটা পরে গেলো।
আমি বললাম, ‘মানে? কেন এসেছে? আমাকে নিয়ে যেতে??’
আমার মন এখনো বলে ইশ…কেউ যদি আমাকে নিয়ে যেত এখান থেকে। আমার ছোট্ট সংসারে আমি ফিরে যেতে চাই। এই আশ্রম নামের কারাগার থেকে মুক্তি পেতে চাই।
খাবার সে ভাবে রেখেই বাহিরে গেস্ট রুমে গেলাম। দেখলাম আমার সেই ছোট্ট লিলিপুট ও তার বউ বসে আছে। ছোট বেলা আদর করে ছেলেটাকে লিলিপুট বলে ডাকতাম। এতা নিয়ে স্ত্রীর সাথে কত রাগারাগি হইছে। সে বলতো নিজের সন্তান কে এসব নামে ডাকতে নেই।
নাহ…সেই ছোট্ট লিলিপুট আজ কত বড় হইছে…বিয়ে করেছে। একটা মেয়ে হয়েছে।
আরে তাই তো!! মেয়েটাকে তো দেখছি না এদের সাথে।
” আব্বা, কেমন আছেন? “
ছেলের কথায় সংবিত পেলাম।
” হ্যা বাবা ভালই আছি। তোমরা কেমন আছ? সব ভালো তো? “
” এখানে আপনার কোন কষ্ট হচ্ছে না তো??”
” না বাবা…তুমি ভালো যায়গাতেই দিছো। এরা অনেক যত্ন করে”। তা বাবা ত্রয়ী কে তো দেখছি না। সে কি স্কুলে??”
” না আব্বা…আপনার নাতনী ভিষন অসুস্থ। আপনাকে দেখতে চায়। হাসপাতালে রেখে এসেছি”
” কি বল!!!কি হয়েছে???” অবাক হয়ে বললাম।
” গাড়িতে উঠুন আব্বা।সব বলছি”
আমাকে ধরে সে গাড়িতে উঠালো। ছেলের হাত যে শেষ কবে ধরেছিলাম মনে পরে না।
গাড়িতে উঠে বসার পর সে বললো…
” আব্বা, ত্রয়ী গত কাল আক্সিডেন্ট করেছে। প্রচুর রক্তক্ষরন হয়েছে। ওর ও-নেগেটিভ ব্লাড গ্রুপ। কয়েক ব্যাগ রক্ত দিতে পেরেছি অনেক খুজে। আর দুই ব্যাগ রক্ত লাগবে। আপনার তো ও-নেগেটিভ ব্লাড গ্রুপ। আপনি প্লিজ রক্ত দিয়ে আপনার নাতনী কে বাঁচান।”
মুখ দিয়ে বললাম শুধু, ‘ আচ্ছা বাবা, তারাতারি চল’
হাসপাতালে গিয়ে দেখলাম আমার সেই প্রিয় ত্রয়ী মামনী কে। ছোট থেকেই আমার কাছে থাকতো বেশি। আমার সাথে খেলতো। ওকে নিয়ে পুতুল খেলতাম।
কিন্তু আমার সাথে মিশলে নাকি স্বভাব খারাপ হয়ে যাবে এই কারনে আমার ছেলে আর ছেলে-বউ এর মদ্ধে ঝগরা লাগতো। শেষে একদিন নিজেই ছেলেকে গিয়ে বললাম, ‘আমার এখানে খুব একা লাগে…কোথাও দিয়ে আয় যেখানে অনেক বন্ধু পাব!!’
আমাকে তারপর এই বৃদ্ধাশ্রমে নিয়ে আসা হয়। আসার সময় ত্রয়ি মামনী অনেক কেঁদেছিলো। ওর ছেলে পুতুলের সাথে আমার নাতনী পুতুলের বিয়ে দেওয়া আর হয় নি।
” আব্বা…এগুলা খেয়ে নিন। বল পাবেন। কারন একটু পর রক্ত দিবেন তো!!!”
দেখলাম ছেলে আমার আপেল, কমলা আর আঙুর এনেছে। এই আপেল খাওয়ার কত ইচ্ছে ছিলো কিন্তু এখন আর সেই ইচ্ছে নেই।
আমাকে বেডে শোয়ানো হলো। পাশের বেডে ত্রয়ী মামনী শুয়ে আছে। মাথায় ব্যান্ডেজ। আহা না জানি কতই কষ্ট হচ্ছে। দোয়া করলাম, ‘হে মহান আল্লাহ আমি যদি জীবনে কোন পুন্য করে থাকি তার বিনিময়ে তুমি আমার মামনী কে ভালো করে দাও আর আমার সন্তানকে সুখে রেখো’
আমার শরীর থেকে রক্তের ধারা উপরে উঠে যেতে দেখছি। অন্যান্য বুড়াদের মত আমারও অতীতের কথা মনে পরে গেলো। আমার স্ত্রীর সামনে আমার ছেলেটাকে বলতাম, ‘বাবু সোনা!!তুমি কাকে বেশি ভালোবাসো??’
ছোট্ট ছেলেটা তখন আমার গলা জরিয়ে ধরে বলতো, ‘ আব্বু তোমাকে!!!’ আমি তখন কমলার খোসা ছিলে আমার ছোট্ট বাবুটিকে খাওতাম।
আসলেই সে আমাকে অনেক ভালোবাসে…এই তো আমাকে আজ আপেল, কমলা খাওয়াইলো। এমন ছেলে কয়জন বাবা পায়???
কি ব্যাপার আমার চোখ ভিজে যাচ্ছে কেনো। তারাতারি অন্যদিকে মুখ ফেরালাম যাতে আমার চোখের জল কেউ না দেখতে পায়।
নাহ…বৃধাশ্রমের অন্য বুড়া গুলার মত দেখছি আমিও পাগল হয়ে গেছি। অতীতের কথা ভেবে কাঁদছি।
একটা দির্ঘশ্বাস বের হয়ে আসলো বুক চিড়ে। ছেলে, ত্রয়ী মামনিকে দেখে আসলেই অনেক সুখ লাগছিলো।
কিন্তু এই সুখ যে আর বেশিক্ষন থাকবে না।কারন একটু পর আবার যেতে হবে আমাকে সেই বৃদ্ধাশ্রম নামের কারাগারে।
সব বুড়া গুলা সবার সামনেই চোখের জল ফেলে। কিন্তু কেউ জানেনা এখনো প্রতিরাতে এই চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় জল বের হয়। আমার লিলিপুটকে না দেখে থাকতে যে আমার খুব কষ্ট হয়। ছেলেটাকে কত পিঠের উপর নিয়ে ঘুরেছি। ‘আব্বু তোমাকে ভালোবাসি’ কথাটা আর একবার যদি শুনতে পেতাম!!!
‘তুমি কি শুনতে পাচ্ছ আকাশ থেকে? মৃত্যুর আগে বলে গেছিলে আমি যেনো আমাদের সন্তানকে হাসি খুশিতে রাখি সবসময়। কখনো যেনো কষ্ট না দেই। সব সময় যেনো আগলে রাখি।
দেখো আমি তোমার একটা কথা রেখেছি। ছেলেটাকে আর কষ্ট দেই না। কিন্তু তোমার শেষ কথা টা রাখতে পারিনি। ছেলেটাকে আগলে রাখতে পারিনি। আমাকে মাফ করে দিও। আর অপেক্ষা করো। আমি আসছি তোমার কাছে। খুব বেশি দেরি আর নেই। আমি আসছি’
লিখাঃ FH Shishir

No comments:

Post a Comment