Sunday, April 13, 2014

এক মুঠো সুখ: একটি ভালবাসার গল্প

তাকে আমি দেখেছি বহুবার কিন্তু সেবার মেজ মামার বিয়েতে সন্ধ্যার আবছা অন্ধকাওে মোমের আলোয় তাকে দেখলাম নতুন রুপে। যেন আমি এই মেয়েটিকে এর আগে কখনও দেখেনি! আমার হৃদস্পন্দন বেড়ে গিয়েছিল হাজারগুণ, আমি অপলক শুধু তাকিয়েই ছিলাম তার দিকে। বিয়ে বাড়ীর কোলাহলে আমি এক শুভ্র নীরবতা অনুভব করলাম নিজের ভিতরে। সেই প্রথম কোন মেয়েকে ভাললাগার আবেশ আমার বুকের মাঝে। সময়টা ২০০৩ সালের ডিসেম্বর মাস, আমি এইচএসসি পরীক্ষা দিব আর সে মেয়েটি সবেম াত্র ক্লাস টেন এ পড়ে। দূর সম্পর্কের খালাতো বোন হওয়াতে ছোট বেলা থেকে বছরান্তে এক দুই
বার আমাদের দেখা হতো, বিশেষ করে দুই ঈদের ছুটিতে।
মধ্যবিত্ত পরিবারের নানা দশর্ন কাঁধে নিয়ে আমার বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাড়াঁতে হবে; অপেক্ষাকৃত উচ্চবিত্তের কোন ছেলে বা মেয়ের সাথে কোন বন্ধুত্ব তৈরি করা যাবেনা; বাবা-মা কষ্ট পান এমন কোন কাজ করা যাবে না; এরকম ইত্যাদি ইত্যাদি জ্ঞান ছোট বেলা থেকে রপ্ত করেই বড় হয়েছি। অন্যদিকে মেয়েটি বেড়ে উঠেছে অপেক্ষাকৃত বিত্তের মাঝে কিন্তু পারিবারিক জীবন ছিল ভীষণ অসুখী। বাবা-মা এর মাঝে ছোট্ট বিষয়গুলো নিয়ে বিবাদ ও সংঘাত পূর্ণ সম্পর্কের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এক ধরণের বিচ্ছিন্ন পারিবারিক কাঠামোর মাঝে মেয়েটির কৈশব কেটেছে। এর ফলে বিয়ে ও পরিবার নামক প্রতিষ্টানটিকে ছোটবেলা থেকে সে কোন ভাবেই সুখের আশ্রয়স্থল বলে মনে করতোনা।
২.
মাত্র দিন সাতেক পরে এইচএসসি ফাইনাল পরীক্ষা কিন্তু পড়ার টেবিলে বইয়ের কোণে প্যাডের এক টুকরো পাতা যেখানে মেয়েটির হাতের লিখা একটি বাসার ঠিকানা ও টেলিফোন নম্বর। বারবার সেই চিরকুট ছুঁয়ে দেখলেও আমার মন ভরছেনা। মেজ মামার বিয়ের অনুষ্ঠানের দিনগুলো বারবার মনে পড়ছে, ছাদের এককোণে দাঁড়িয়ে মেয়েটির সঙ্গে পাশাপািশ দাঁড়িয়ে চাঁদ দেখার স্মৃতি চোখ ভিজিয়ে দিচ্ছে বারবার। এর আগে তো এমন হয়নি! তবে আজ কেন?! তবে কি মেয়েটিকে আমার ভালো লেগেছে নাকি ভালোবেসে ফেলেছি? আচ্ছা, মেয়েটি কি আমাকে মনে রেখেছে? নাকি ইট পাথরের শহরে গিয়ে ব্যস্ততার মাঝে আমাকে ভুলে গিয়েছে? এরকম হাজারো প্রশ্ন নিত্য আমার মনে বাসা বাঁধতে শুরু করলো। অবশেষে মনের লাগাম টেনে ধরতে ব্যর্থ হয়ে ফোন করলাম একটি টিএনটি নাম্বারে। ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এলো এক গুচ্ছ শিশির কোণা- হ্যালো! আমি কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলাম। খানিবাদে সম্ভিত ফিরে পেয়ে বললাম, খালা আছে? আমি লিও (আমার ছদ্ম নাম) বলছি। মেয়েটি আমার কন্ঠ শুনে একটি হাসি দিয়ে বললো, “কেমন আছো?” আমি বললাম, “পরশুদিন পরীক্ষা। আমি ভালো নেই।”সে বললো, “কেন?” আমি বললাম, “পরে বলবো। যদি কোন দিন সময় আসে তাহলে বলবো তোমাকে।”… এরপর এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হলো। ভর্তি পরীক্ষার চাপে যখন আমি চাপা পড়ছিলাম তখন কোন এক অজানা অনুপ্রেরণা আমাকে সাহস জুগিয়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল আমি পাবলিক ভার্সিটিতে পড়তে পারলে হয়তো মেয়েটিকে বলতে পারবো আমার অনুভুতির প্রতিটি শব্দ। শত ব্যস্ততার মাঝে আমার অবসর বলতে ছিলো শুধু তারই ধ্যানে অবগাহন।

ভার্সিটির প্রথম দিন। অনেক পরিশ্রমের পর পানি পথের যুদ্ধ জয় করে আমি যেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেলাম। চারেদিকে জীবনের জয়োচ্ছাস, সবাই উৎসব উৎযাপন ভঙ্গিতে প্রথম ক্লাসে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে আর আমি তাকেই ভীষণ মিস করছি। অদ্ভুত এক অনুভূতি! চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে রোজ (ছদ্ম নাম) আমি পেরেছি; তুমিই তো চেয়েছিলে আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েতে ভর্তি হই। যেই চিন্তা সেই কাজ। ক্লাস শুরুর আগে টেলিফোন বুথ থেকে আবারও সেই টিএনটি নাম্বারে ফোন করলাম। কিন্তু কেউ ওপাশ থেকে ফোন ওঠালো না। ভার্সিটির প্রথম দিন কটলো ভীষণ বিষন্নতার মাঝে।
…অত:পর এই বিষন্ন রোগটি আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেতে লাগলো। কোন কিছুতেই যেনো আমার মন বসছেনা। চারেদিকে বন্ধুরা যখন নতুন ক্যাম্পাস লাইফ উপভোগ করছিলো তখন আমি বিষন্ন কোন গাছের নিচে বসে তার ধ্যানে মত্ত! জানিনা আমার ভিতরে তার প্রতি ভাললাগা কখন ভালবাসায় রুপ লাভ করতে শুরু করেছে। আমি এ সময়টাতে ভীষণ অনিরাপদ বোধ করতে শুরু করলাম কারণ যাকে ঘিরে আমার এই অনুভূতি সে মেয়েটি আমাকে কি ভাবে ভাবছে? তাছাড়া দীর্ঘ ৭-৮ মাস তাকে চোখের দেখাও দেখিনি, আর আলাপ তো দূরের কথা! মাঝে মাঝে একা একা হাসি এই ভেবে যে আমি আমার কল্প রাজ্যে প্রতিদিন তার যত কাছে আসছি তা শুধুই একতরফা। এমনও তো হতে পারে মেয়েটি আমাকে এ নজরে দেখেইনি কখনও! এই ভাবনাগুলো আমাকে হতাশার মাঝে নিমজ্জিত করে বারবার। এক অজানা আতঙ্কে আমি সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি। সে আতঙ্কের নাম তাকে না পাওয়া।

সকল শঙ্কাকে সাথে নিয়ে আমি দেখা করতে যাচ্ছি রোজ এর সাথে। গতকাল টেলিফোনে খালার সাথে কথা বলে জানতে পারি রোজ ভীষণ অসুস্থ্য হয়ে পড়েছিলো; হাসপাতালে থাকতে হয়েছে বেশকিছুদিন। বর্তমানে সুস্থ্য এবং ডাক্তারের পরামর্শে বায়ু পরির্তনের জন্য সে নানার বাড়ীতে বেড়াতে এসেছে । আমিও ভীষণ উত্তেজিত এই ভেবে যে, তার সাথে প্রায় ৯ মাস পরে দেখা হবে সেই বাড়ীতেই যেখানে তাকে প্রথম আমি ভালোলাগার দৃষ্টিতে দেখি মোম বাতির আলোতে।
ড্রয়িং রুমে বসে আছি। অপেক্ষা করছি কখন কিছুক্ষণের জন্য রোজ এর সাথে আমি আমার মনের কথা বলতে পারবো। ঘড়িতে তখন সন্ধ্যা ৬:১৫ টা। হঠাৎ সে রুমে প্রবেশ করলো। আমার হৃদপিন্ড মুখের কাছে আসার জোগাড়! টিভির চ্যানেল পরিবর্তন করতে করতে আমি বললাম, “তোমাকে আমার কিছু বিষয় শেয়ার করার আছে? আসলে এটা তোমাকে আমার বলতেই হবে। না হলে আমি নিজেকে কখনও ক্ষমা করতে পারবোনা।” আমার কথা শুনে সে বললো, “আমারও তোমাকে কিছু বলার আছে। তবে তুমি আগে বলো, তারপরে আমি বলবো।” …
এরপর কিছুক্ষণ নিরবতা।. . . হঠাৎ আমি যেন ঘামতে শুরু করেছি, আমার শরীর কাঁপছে, গলা শুকিয়ে আসছে। কিন্তু মনের ভিতরে এক ধরণের সাহস সঞ্চার করে প্রথম তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, “Do you want to make love affair with me? If your answer is ‘not’ then I have no problem. But I need your answer right now.” এক নি:শ্বাসে কথাগুলো বলে তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম সে কিছু না বলে বোবার মতো আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এর কিছুক্ষণ পরে সে বললো, “আমি অন্য সব মেয়ের মতো নই। এইসব বিষয় আমি কখনও সার্পোট করিনি কিন্তু আজ নিজেই…”- এই কথাটুকু বলে খানিকক্ষণ চুপ থেকে বললো, “তোমার কি এর জবাব এখনই লাগবে?” আমি বললাম, “আপাতত এক গ্লাস পানি লাগবে।” আমার দিকে তাকিয়ে অর্থপূর্ণ হাসি দিয়ে সে পানি নিতে ভিতরে চলে গেল। আমি আমার মাথার মাঝে কেমন যেনো শূন্যতা অনুভব করলাম।
প্রায় ১০ মিনিট পরে সে এক গ্লাস পানি নিয়ে ফিরলো। পানি দেওয়ার সময় আমার হাতে একটি চিরকুট দিয়ে বিদ্যুৎ বেগে চলে গেলো। আমি পানি খাওয়া বাদ দিয়ে চিরকুটটি খুলে পড়লাম। মাত্র কয়েকটি লাইন কিন্তু মনে হচিছল কয়েক হাজার পৃষ্ঠার কোন দৈববাণী যার অপেক্ষায় আমি হাজার বছর ধরে অপেক্ষায় রয়েছি। লিখাগুলো ছিলো এরকম-
“ যদি আমার উত্তর যদি শুনতে চাও তাহলে ‘হ্যাঁ’। তুমি আমাকে পছন্দ করার অনেক আগে থেকেই আমি তোমাকে পছন্দ করতাম কিন্তু প্রচন্ড ভয়ে তা বলতে পারিনি। আমি ভেবেছিলাম তুমি তোমার কলেজের কোন মেয়েকে পছন্দ করো। জানিনা তুমি আমাকে কি ভাবলে..?”
তারিখটা ছিলো ০৭ আগস্ট ২০০৪। আমার জীবনের দৈবাৎ ঘটে যাওয়া এক স্বর্গীয় ঘটনা যা আগে কখনও ঘটেনি। আমার সত্তার সাথে আমার নতুন রুপে পরিচয় ঘটলো এ ঘটনার মধ্যে দিয়ে। জীবনে প্রথম ভালোলাগার মানুষকে ভালোলাগার কথা বলতে পারা ভাগ্যের ব্যাপার!
৫.
আজ ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৪। মাঝে কেটে গেছে ৯ টি বছর! এক আকাশ স্বপ্ন, ছোট কষ্ট, আর নির্ঘুম রাত পার করে আজ যখন আমার ভালবাসার গল্প লিখতে বসেছি তখন আমার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী তার বাবার বাড়ীতে বেড়াতে গিয়েছে! প্রিয় পাঠক,ভাবছেন সে কে? . . . সে আর কেউ নয়, সে আমার জীবনে এক মুঠো সুখ যাকে তিলে তিলে ধারণ করেছি গত ৯ বছর তথা ৪৭৩০৪০০ মিনিট অথবা ২৮৩৮২৪০০০ সেকেন্ড ধরে। আজ তার বিরহে আমি যখন কাতর ঠিক তখনই স্মৃতিগুলো এলোমেলো হয়ে আমার চোখ ভিজিয়ে দিচ্ছে বারবার। আমাদের চলার পথ কখনও ফুলেল ছিলোনা। আত্মীয়তার মাঝে এধরণের সম্পর্ক যখন কেউ মানতে পারেনি তখন আমরা সৃষ্টিকর্তার কাছে ফরিয়াদ করে শুধু অপেক্ষা করেছি। শেষে সৃষ্টিকর্তা আমাদের স্বপ্ন পূরণ করেছেন। তার বিশেষ রহমত না থাকলে কোনমতেই ৫০০ কি.মি দূর থেকে নয় বছর ধরে একটি সম্পর্ক আমরা ধরে রাখতে পারতাম না। আজ আমরা বিশ্বাস করি, ভালো কিছু পেতে হলে অসীম বিশ্বাস আর ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করতে হয়।
অবশেষে ২৪ জানুয়ারি ২০১৪, আমরা আবদ্ধ হলাম এক স্বর্গীয় বন্ধনে। রাত ১২.৩০, আমি বাসর ঘরে মোমবাতির আলোয় তাকে আরও একবার দেখলাম যেমনটা দেখেছিলাম ১১ বছর আগে! এই প্রথম হারানোর শঙ্কা না রেখে আমি তাকে বললাম, “আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি।” উত্তরে সে বলেছিলো, “ আমিও তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি।”
আজ এই ভালবাসা দিবসে ভালবাসার গল্পের মধ্যে দিয়ে সারা পৃথিবীর সামনে আমি বলতে চাই, “ তাবা, আমি তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি। তুমি যখন আমার পাশে থাকো তখন প্রতিটি দিন আমার ভ্যালেন্টাইন ডে; প্রতিটি মূহুর্ত আমারবসন্ত । তুমি আছো বলেই আমি স্বপ্ন দেখতে শিখেছি। তুমি আছো বলেই আমার পৃথিবী আজ পূর্ণ। তুমি আমার এক মুঠো সুখ। ভালোবাসি তোমাকে, খু-উ-ব বেশি. . .।”

No comments:

Post a Comment